রম্য

চক্র – মুহসিন ইরম

এক.
ছলিম ভাই। আমাদের মহল্লার শান্তশিষ্ট, লেজবিশিষ্ট অতিমহৎ ব্যক্তি। ছোট-বড় সকলের কাছে সমান সমাদৃত আর গ্রহণযোগ্য। মহল্লাবাসীর বিপদআপদে সবার আগে হাজির হন এই ছলিম ভাই। অসম্ভব রকম লাজুক আর বিনয়ী ভাইটার বোকামি করাটা রক্তে মাংসে মিশে আছে। রাস্তায় বের হলে মুরুব্বি টাইপের লোক তো বটেই ছোট বাচ্চাকাচ্চাকেও সালাম দিতে ভোলেন না তিনি।

দুই.
লাজুকলতা ছলিম ভাই মাস শেষে আজই বেতন পেয়েছেন। অন্যান্য দিনের মতো তাই আজ এত দ্রুত বাসায় ফিরতে পারছেন না। বেতন যার কাছ থেকে গ্রহণ করেন তিনি সাংসারিক আলাপে অযথা সময়ক্ষেপণ করেছেন। বেতন তোলা হলে ছলিম ভাই ঘড়িতে তাকিয়ে দেখেন রাত ১১টা বাজে। এত রাতে বাস পাওয়া মুশকিল। রিকশা, সিএনজিও নেবে ডাকাইত্যা ভাড়া।
তবে সুখের কথা হলো, ছলিম ভাই চিপাগলি দিয়ে শর্টকাট রাস্তা ভালোই চিনেন। ছোটবেলা থেকে এই এক মহল্লাতেই বসবাস। মহল্লার প্রতিটি ইট-বালু তার নখদর্পনে। রাত বেশি তাই দ্রুতপায়ে হাঁটছেন ছলিম ভাই। খানিকটা আতঙ্ক তো আছেই। হঠাৎ পথ আগলে দাঁড়াল তিনজন। অচেনা মুখ, ফ্ল্যাটবাসার অস্পস্ট আলোয় সামান্য বোঝা যাচ্ছে প্রত্যেকেই অস্ত্রধারী।
ছলিম ভাই কোনোকিছু বোঝার আগেই লিডারের মতো একজন বলল, ‘মিয়া ভাই! ফাও কথাবার্তা বাড়ায়া লাভ নাই, যা আছে বাইর কইরা সুস্থ মতো হাঁইটা যান, আমরা কয়জন ছিনতাইকারী খাইয়া-পইড়া বাঁচি।’ ছলিম ভাই কথা বাড়াননি। শেষমেশ রিক্ত হস্তে ছলিম ভাইকে বাসায় ফিরতে হলো, এবারের হাঁটার গতি অত্যধিক ধীর।

তিন.
ছলিম ভাইকে নিয়ে মহল্লায় তুলকালাম কাণ্ড। মাথা পুরোটাই গেছে বলে রটনা। আমি হঠাৎ আগামাথা কিছু না বুঝে সরাসরি ছলিম ভাইয়ের বাসায় হাজির হলাম। ছলিম ভাইয়ের দরজায় মহল্লার দু’একজন পাতি মাস্তান দাঁড়িয়ে আছে। আমার মাথা আরো গুলালো, ভদ্র আর লাজুক ছলিম ভাইয়ের গেটে পাতি মাস্তান এটা সম্ভব কীভাবে? সরাসরি ছলিম ভাইয়ের রুমে ঢুকে পড়লাম। ওমা! আমার চক্ষু চড়কগাছ! ছলিম ভাই বিভিন্ন অস্ত্র পরখ করছেন, গায়ে বখাটেদের মতো জামা-প্যান্ট। আমাকে দেখেই তুমুল আগ্রহে বলে উঠলেন, ‘নতুন ব্যবসায় নামছি, ছিনতাই। তুই আমার কাছের ভাই হিসেবে সহযোগী হয়া যা, নইলে কিন্তু খবর আছে। আর আইজ থিকা আমার নাম হইল ছাগলা ছলিম। কি মনে থাকব তো?’
‘জি ভাই! থাকব…’ ঢোঁক গিলে কোনোমতো কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললাম।
‘আইচ্ছা, আইজ রাইতেই প্রথম ধান্দা সময়মতো আয়া পড়িস।’

চার.
আজকে ছলিম ভাই টিমের মিশন মিরপুর ১০, চিপাগলি। একটা গাড়ি আসছে। ছলিম ভাই উত্তেজিত কণ্ঠে কমান্ড করছেন। ভয়ে আমার ইয়ে চেপে গেল। ছলিম ভাইকে মৃদুগলায় ইয়ের ব্যাপার বলতেই এক থাপ্পড় দিয়ে বললেন, ‘প্রথম কামেই কুফা লাগাইলি, যা জলদি যা।’ দ্রুত গলির চিপায় গেলাম। মহাসুখে প্রাকৃতিক কর্ম সেরে স্পটে গিয়ে দেখি সব হাওয়া। ছলিম ভাই টিমসহ উধাও।

পাঁচ.
ঘটনা মহাপ্যাঁচময়। ছলিম ভাই যে গাড়িটা টার্গেট করে প্রথম খেপ মারতে চেয়েছিলেন, ওটা ছিল ডিবি পুলিশের। পরের কাহিনিটুকু পাঠক আপনিই বুঝে নেন।
আমি কিছুদিন নিরাপদ দূরত্বে সেন্টমার্টিন ঘুরে আসি।

মন্তব্য করুন