প্রবন্ধ বিশেষ

হারানো শৈশব – আহমাদ কাউসার

হাঁটছিলাম বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে। হঠাৎ পাশে একটা বালির ঢিবির উপর দৃষ্টি আটকে গেল। অল্প বয়সের কয়েকটা শিশু খেলা করছে, আনুমানিক ৬-৭ বছর হবে। একবার দৌড়ে বালির উপরে উঠছে, আবার নামছে, দেখে খুব ভালো লাগলো। স্মৃতিপটে আমিও চলে গেলাম আমার সেই হারানো শৈশবে। খুবই দুরন্ত ছিলাম, দুষ্টুও কম ছিলাম না। আমি তখন ছোট, মাদ্রাসায় অনাবাসিক পড়তাম, মাদ্রাসার পিছনে ছিল একটা বরই গাছ। ‌বরই মৌসুমে প্রত্যেক বিকেলে হাজির হতাম গাছটার নিচে। হাতে থাকত কয়েকটা কংক্রিট অথবা পাথর, একটা পাথর ছুড়ে মারতেই ৫-৬ টা বরই পড়তো, আর আমরা দৌড়ে গিয়ে ১০-১২ জন একসাথে হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। কেউ বরই পেত, আবার কেউবা খালিহাতে ফিরত। ঝড় বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই,  আমাদের আর কে পায়! ‌ দুষ্ট ছিলাম বলে আবার কারো আদর থেকে বঞ্চিত হয়নি। দরসের সময় হুজুর পাশে নিয়ে দরস করাতেন। সকালের নাস্তা করতাম না বলে একদিন আম্মু মোমেনশাহী হুজুরের কাছে বিচার দিলেন। ‌ হুজুর ডেকে বললেন, কাল থেকে প্রতিদিন সকালে আমার বাসায় নাস্তা খাবে। বাধ্য ছেলের মতো মেনে নিলাম। এরপর থেকে হুজুরের বাসায় নাস্তা খেতাম। হুজুর পাশে বসিয়ে নাস্তা খাওয়াতেন। আর সামনে একটা বেত রেখে দিতেন। ‌ এখনো মনে আছে, দুপুরে মাদ্রাসায় আসার সময় আবদার করতাম, আমাকে দুই টাকা করে দিতে হবে, না হলে মাদ্রাসায় যাব না। একদিন আব্বু টাকা দেন নি। সে কি কান্না! মাদ্রাসায় আর যাব না, এই বলে কান্না করছিলাম। ‌ আমি আর ভাইয়া পিঠাপিঠি বয়সের ছিলাম। দুজনেই খুব দুষ্ট ছিলাম। একদিন আমি আর ভাইয়া আমাদের বাড়ির পাশে এক কাঁঠাল গাছে উঠে দুষ্টুমি করছিলাম। ভাইয়া বলল-এই জুবু! জানিস বাদুর কিভাবে ঝোলে? ভাইয়া পা দুটো উপরের দিয়ে শক্ত করে একটা ডাল চেপে ধরল, আর পুরো শরীর শূন্যে ছেড়ে দিল। এভাবে কিছুক্ষণ ঝুলে থাকার পর হঠাৎ ভাইয়া মাটিতে পড়ে গেল। ‌ আমি দ্রুত গাছ থেকে নেমে বাসায় গিয়ে আব্বুকে বললাম। আব্বু দ্রুত এসে ভাইয়া কে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। পরে জানতে পারলাম, ভাইয়ার কোমর ভেঙ্গে গেছে। ভাইয়া কয়েকদিন হাসপাতালে এসে থাকার পর বাসায় ফিরে আসলো। ডাক্তার ভাইয়াকে সম্পূর্ণ রেস্টে থাকতে বললেন। শুয়ে শুয়ে একদিন আমাকে ভাইয়া বলল:-দেখলি জুবু! অসুস্থ হওয়ার কত সুবিধা!? আমিতো অবাক, বল কি ভাইয়া? অসুস্থ হলে আবার অসুবিধা কোথায়? ভাইয়া বলল, দেখ, আমি অসুস্থ হওয়ায় সবাই কত রকম ফল ফলাদি আপেল, আঙ্গুর নিয়ে আসে। আর আমি সেগুলো কি মজা করে খাই। আমি বললাম:- ও এই কথা,… ঠিক আছে, ভালো। এই কথা বলে আমি সেখান থেকে কেটে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর যখন দেখলাম আম্মু ঘরে নেই, অমনি ঘরে ঢুকে এক থোকা আঙ্গুর নিয়ে দে ছুট! কোথায় আড়াল হয়ে খাওয়া যায় ভাবছিলাম, তখন সামনে তাকিয়ে দেখি সেই গাছ। চট করে গাছে উঠে পড়লাম। গাছে বসে আঙ্গুর খাওয়ার স্বাদই আলাদা। একটা ডালে ভাইয়ের মতো পা ঝুলিয়ে খাচ্ছিলাম, একটা কাকের সহ্য হচ্ছিল না। গা ঘেঁষে একটা ডালে বসল। প্রচন্ড ভয় পেলাম! কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। থপাস করে নিচে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।

চোখ খুলে আবিষ্কার করলাম, কিছুই চিনতে পারছিনা। সবকিছু কেমন ঘোলাটে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে মরে গেছি। কিছুক্ষণ পর একটা লোক দেখলাম এপ্রোন পরা, গলায় স্টেথোস্কোপ, তখন বুঝতে পারলাম আমি হাসপাতলে। নড়াচড়ার চেষ্টা করলাম। তা খুব ভারী লাগছিল। তাকিয়ে দেখি পা প্লাস্টার করা। বুঝলাম, গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে গেছে। মনে মনে তওবা করলাম, কাঁঠাল গাছে বসে আর আঙ্গুর খাব না।

আহমদ কাউসার

শিক্ষার্থী

মন্তব্য করুন