গল্প নির্বাচিত

সাইকেল রাইড ও একটি বন্ধুত্বের গল্প – সাব্বির সাদি

নতুন সাইকেল চালাতে শিখেছি । প্রতিদিন বিকেলে গ্রামের কাঁচামেঠোপথে সাইকেল নিয়ে বেরোই । ফিরতে হয় সন্ধ্যার আগে আগে ।সারাদিন স্কুল, প্রাইভেট । এততুকু সময় সাইকেল চালিয়ে মন ভরেনা । আব্বুর ভয়ে স্কুল কামাই দেবারও সুযোগ নেই। পাছে সাইকেলটাই হারাতে হবে । দিনকয়েক পরেই স্কুল ঈদের ছুটি শুরু হল । সেদিন খুব সকালে সাইকেল নিয়ে বের হলাম । গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে বহুদূর গেলাম । মন যেদিকে চায়, চোখ যেদিকে যায় । যেতেযেতে একটা পার্ক দেখতে পেলাম । সাইকেল নিয়ে পার্কের ভেতরেঢুকে পড় লাম । কী মনোরম পরিবেশ! যেদিকে তাকাই শুধু গাছ আর গাছ ।

ফুলেরগাছ, ফলের গাছ আরও হরেক প্রজাতির নাম না জানা বিদেশি গাছ। জায়গাটা বেশ সাজানো গোছানো । মাঝখান দিয়ে পরিচ্ছন্ন ইটফেলা রাস্তা । পথের পাশে দু’টো নারকেল গাছের মাঝে একটা করে বেঞ্চ ।সামনে বিশাল দিঘি । স্বচ্ছ পানি টলমল করছে । মাছেরা দলবেঁধে সাঁতার কাটছে । হালকা বাতাস এসে দিঘির জলে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ তুলছে । সেই ঢেউয়ে সূর্যের আলো খেলা করছে । এক কোণায় একটি নৌকা বাঁধা । ইচ্ছে করছে—সাইকেল রেখে নৌকায় উঠি । প্রথম দেখাতেই পার্কটির প্রেমে পড়ে গেলাম । তারপর থেকে প্রতিদিন যেতাম পার্কে । ছোট্ট মনের প্রেম বলে কথা! ঈদের পরদিন বিকেলে গেছি । প্রচণ্ড ভিড় সেখানে ।

মানুষেগিজগিজ করছে পার্ক । দেখলাম—আমার সমবয়সী দুটি ছেলে-মেয়ে সাইকেল চালাচ্ছে । বারবার তাকাচ্ছি ওদের দিকে । কাছে গিয়ে কথা বলার সাহস হচ্ছে না । দেখতে পেয়ে ওরাই কাছে ডাকলো আমাকে । নাম পরিচয় গিজ্ঞেস করল । ওরা ওদের নাম-পরিচয় বলল । পরিচয় পর্ব শেষে আমাকে বন্ধু করে নিলো ।সাইকেল চালানোর দুজন বন্ধু পেয়ে আমার আনন্দ যেন আর ধরেনা । ওরা দুজন ভাই-বোন । বাবামার সাথে ঢাকায় থাকে । ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে । আমাদের বন্ধুত্ব খুব জমলো ।

প্রতি সকালে আমরা সাইকেল নিয়ে বেরোতাম । সারাদিন নতুন নতুন জায়গায় ঘুরতাম, হৈ-হুল্লোড় করতাম । বাড়ি ফিরতাম সূর্যডোবা সন্ধ্যায় । খুব মজা করতাম তিনজনে । এভাবে দেখতে দেখতে আমাদের ছুটিশেষ হয়ে গেল । আমার স্কুল খুলল । ওরা চলে গেল ঢাকায় । কিন্তু ওরা স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল আমার মনের কোণে, আমার হৃদয়ের গহীনে । আর কোন ঈদে ওদের দেখা পাই নি আমি । ঈদ এলেই পার্কে যেতাম। ওদের খুঁজতাম । পেতাম না । বুদ্ধি করে ওদের বাড়িটা চিনে রাখি নি । এজন্যে খুব আফসোস হয়েছে পরে ।

মেঘে মেঘে বেলা গড়াল অনেক । একদিন আমিও ঢাকা এলাম পড়ালেখা করতে । মাঝে মাঝেই মনেপড়ে ওদের কথা । মনেমনে খুঁজি । পাইনা। তখন মনটা ভীষণ খারাপ হয় । কোটি মানুষের ভিড়ে ওদের খুঁজে পাওয়া সহজ নয় । নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেই । এক শুক্রবার সকালে পল্লবীর আবাসিক রাস্তা ধরে আনমনে হাঁটছিলাম । আকাশে মেঘ ছিল । ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামছিল । ইচ্ছে করেই ভিজছিলাম । ভাল লাগছিল ভিজতে । –সাদি, কেমন আছ? হঠাৎ মেয়ে গলার আওয়াজে চকিত হয়ে পিছন ফিরলাম । একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পাশে একটি ছেলে । দুজনই রাইডের পোশাকে।

ওদের চিনতে পেরে আমার কি যে আনন্দ লাগছিল বলে বোঝাতেপারব না । ওরাই আমার ছোটবেলার সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধু। এতদিন পর ওদের দেখা পাব তা কখনও ভাবি নি । মেয়েটি বলল—ছোটবেলার রাইডের কথা মনে আছে তোমার? আমি মাথা নাড়লাম । ওদের বাসা আমার ম্যাস থেকে খুব দূরে নয় । বৃষ্টি ভিজে আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম । ছেলেটি বলল—আমরা প্রতি শুক্রবার রাইডে যাই, আজ থেকে তুমিও যাবে আমাদের সাথে ।মেয়েটি পিটপিট চোখে তাকিয়ে জোর দিয়ে বলল—যেতেই হবে তোমাকে । আমি এবারও মাথা নাড়লাম । কারণ, মেয়েটির চোখ অগ্রাহ্য করার সাহস আমার ছিল না । আজও সে সাহস হয়ে ওঠেনি ।

মন্তব্য করুন