গল্প বিশেষ

মৃত্যু এবং দু’ফোটা অশ্রুর গল্প – সাইফুল ইসলাম

বহুদিন পর ডায়েরিতে আসা হলো। আসতে বাধ্য হয়েছি বলা যায়। খুব সম্ভবত এই ডায়েরির শেষ লেখা হবে এটি।
একটা মৃত্যু, একটা জীবনের বিয়োগ, একটা স্থানান্তরের গল্প থাকবে এই লেখায়। শেষ লেখাটা একটা “শেষে”র গল্প। একজন কিংবদন্তির অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ার গল্প।

দশ মিনিটের ব্যবধানে আমার ফোনে কল এসেছে নয়টি৷ আমি পূণরায় কল করলাম। ও পাশ থেকে আফজল ভাই বললেন, ” তোর নানি মারা গেছে।” আমার কান কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করতে না চইলেও ক্ষানিক সময়ের ব্যবধানে পুরোপুরি বিশ্বাস করে নিলো। এ অমোঘ বিধানের অবিশ্বাস করার সাধ্য কার! আমি বিশ্বাস করলাম এবং খুব ভালো করেই বিশ্বাস করলাম। এই “ভালো করে বিশ্বাস”টা আমার মস্তিষ্কে এমনভাবে গেঁথে গেলো, আমি জিজ্ঞেস করে বসলাম, জানাজা কয়টায়?
এটা জিজ্ঞেস করা যে আমার মোটেও উচিত হয়নি তা টের পেয়েছি আরো পরে। খুব বেশি বিশ্বাস  সম্ভবত মস্তিষ্কে একধরনের চাপ সৃষ্টি করে। সেই চাপ থেকেই হয়তো মস্তিষ্ক  মানুষের আগে আগে কাজ করে। ভাষাজ্ঞান গ্রাস করে নেয়।
আমি যাদের জানাতে পারি, এমন সবায়কে নানির মৃত্যুর সংবাদটা জানাতে পারিনি। কয়েকজনকে পেরেছি শুধু। রাস্তায়, যেতে যেতে, গাড়ীতে বসে রিমাকে কল দিলাম। রিসিভ করলো। বললাম, কই তুই?
ও বললো, জামতলী।
তার কন্ঠে কান্নার স্পষ্ট আওয়াজ। এতক্ষণে আমি খেয়াল করলাম, আমার ভেতরে বিরাট একটা শূন্যতা কাজ করছে। ঠিক শূণ্যতা নয়, কঠোরতা। যে মানুষটা আদরের সুরে শাসন করতেন আবার শাসনের সুরে আদর করতেন, যে মানুষটা যখনই যেতাম তখনই জোর করে পকেটে ২০,৫০,১০০,৫০০ টাকা গুজে দিতেন, যে মানুষটা সবসময় খুশি থাকতে এবং খুশি রাখতে চেষ্টা করতেন। সেই মানুষটার মৃত্যুতে আমার অন্তত গলেনি, চোখ বেয়ে অশ্রু আসেনি। কি এক অদ্ভুত হিসেবের মধ্যে কড়ে গেলাম। একটা অস্তিত্বকে হারিয়ে নিজের মধ্যে মায়ার অপ্রতুলতা দেখেও নিজেকে কিছুই করতে পারলাম না। এই লজ্জা আমি কার কাছে বলি!

রাস্তায় যেতে যেতে বেশ কয়েকবার হাসতে হলো। কারণে অকারণে। নিজের হাসিগুলো নিজেই ঠিক চিনে উঠতে পারিনি তখন।
নানির বাড়ীতে যখন পৌঁছি তখন পোনে দশটা। বুরহান মামা রীতিমতো বিলাপ করছেন। খালা, মা, রিমা, শান্ত, আরো, আরো অনেকে কাঁদছেন। এত সকল কান্না দেখে আমার গলায় দলা পাকিয়ে কিছু একটা এলো। ঠিক এই সময়টাতে একজনকে ফোন করতে গিয়ে বুঝলাম পাথুরে এই পাষাণ হৃদয়ের জমাট বাঁধা মায়াগুলো আসলে উবে যায়নি। কেন যেন ওখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। রাস্তায় চলে আসলাম। রাস্তায় এসে খেয়াল করলাম আমি কাঁদছি। আমার এই কান্নার কারণে নিজেই লজ্জা পাচ্ছি। যদিও এই মূহুর্তের কান্নায় কোন লজ্জা নেই। ইচ্ছে হলেও খুব করে কান্না করতে পারলাম না।  আমি কেন কাঁদছি ভেবে পেলাম না। “জগতের প্রতিটি প্রাণী মরনশীল” এটা ভুলে গেলাম!  না ভুলিনি। এই কান্নার অশ্রুগুলোতে মূলত মায়া ঝরে পড়ে৷ স্মৃতি ঝরে পড়ে। দু’ফোটা অশ্রু গাল বেয়ে নিচে পড়ার দৃশ্য আমি দেখতে পারিনি বা দেখতে চাইনি…!

মৃত্যুর চেয়ে পরম আপন করে পাওয়ার মত দুনিয়াতে আর কিছুই নেই…

আল্লাহ নানিকে জান্নতের উচ্চ মাকাম দান করুন- আমিন।

منها خلقنكم وفيها نعيدكم ومنها نخرجكم تارة اخري….(القران)

রোজনামচার পাতা থেকে
২৯/০১/২০২০
সাইফুল ইসলাম
শিক্ষার্থী

মন্তব্য করুন